5e29359b9d2b5

অটিজম বা অটিজম স্পেক্টার ডিসওর্ডার  একটি জটিল স্নায়ুবিক রোগ যে রোগের শিকার হলো মূলত সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুরা। অটিজম রোগ বা ডিসওর্ডার একটি শিশুর  পূর্নাঙ্গ মানসিক বিকাশে বাধা ঘটায়।এই রোগের মূল উপশম গুলো হলো সামাজিক বিকলতা, কথা বলার প্রতিবন্ধকতা,একইরকম আচরণের পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি।কোন শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যেই শিশুটি অটিজম এ আক্রান্ত কিনা তা নির্ধারন করা সম্ভব হয়।তবে কিছু ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের পূর্বেই মায়ের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা পর্যালোচনা করে শিশুটি অটিজম এ আক্রান্ত হতে পারে কিনা তাও সনাক্ত করা যায়।                   

অটিজম এর নির্দিষ্ট কোন কারণ এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।ধারণা করা হয় যে পারিবারিক জেনেটিক ডিসওর্ডার এর কারনে শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।এক্ষেত্রে মা কিংবা বাবা উভয়ের “জিন” গত ত্রুটির কারণে তাদের সন্তান অটিজম রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

এছাড়াও, কোন মা যদি সন্তান জন্মদানের পূর্বে কোন রকম ড্রাগস এ আসক্ত থাকে অথবা কোন প্রকার মানসিক সমস্যা যেমন ইনসোমনিয়া বা ডিপ্রেশন অথবা কোন প্রকার পার্সোনালিটি  ডিসওর্ডার এ আক্রান্ত থাকে তবে সেই মায়ের সন্তানের অটিজম এ আক্রান্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

তাছাড়াও, কোন শিশুর জন্মের পর শিশুটি যদি  পারিবারিক অশান্তির সম্মুখীন হয় আর খুব ছোট বেলা থেকেই শিশুর উপর শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করা হয় তবে জন্মের পরেও অনেক শিশু অটিজম এ আক্রান্ত হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন।    

শিশুর উপর শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করা হয় তবে অনেক শিশু অটিজম এ আক্রান্ত হতে পারে; Image Source : istockphoto.com

                              

মূলত কোন শিশুর জন্মগ্রহনের প্রথম ১-৩ বছরের মধ্যেই শিশুদের মধ্য অটিজম এর উপসর্গ গুলো দেখা যায়।এই লক্ষ্মণ গুলো হলো;

  • চোখাচোখি দৃস্টি এড়িয়ে চলা

শিশুটি কারো সাথে কথা বলার সময় বা কোন প্রকার ইন্টারেকশনের সময় চোখের দিকে তাকানো এড়িয়ে যাবে।

  • সকল কাজের প্রতি অমনোযোগীতা অথবা কিছু কাজের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া

হয় শিশুটি সকল প্রকার কাজের প্রতি অনিহা প্রদর্শন করবে নতুবা কিছু কাজের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ প্রদান করবে যার কোনটিই স্বাভাবিক নয়।

  • গুছিয়ে কথা বলতে না পারা বা কথাবার্তা জড়িয়ে যাওয়া অথবা অনেক দেরিতে কথা বলতে শেখা

অটিজম এ আক্রান্ত শিশুরা সাধারণত খুব দেরিতে কথা বলা শিখে তাও খুব পরিস্কারভাবে নয় অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় যে কথা বলার সময় তাদের কথাবার্তা জড়িয়ে যায়।          

  • একই কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করা অথবা একইকাজ বারংবার করা

অটিস্টিক শিশুরা গুছিয়ে কথা না বলতে পারার কারণে অধিকাংশ সময়ই একই কথার পুনরাবৃত্তি করে থাকে।তারসাথে কোন কাজ করে তারা আনন্দ পেলে সে কাজটিও বারংবার অর্থাৎ বারবার পুনরাবৃত্তি করে।

  • অন্যের কথা বা  এক্সপ্রেশন বুঝতে না পারা

অটিস্টিক শিশুরা অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের কথা বা নরমাল ইমোশোন গুলো বুঝতে সক্ষম হয়না এবং বোঝাতেও সক্ষম হয়না।

  • সামান্য শব্দে অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে পরা

আরেকটি আচরণ যা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় তা হল কোন বিশেষ শব্দে বা কোন প্রকার উচ্চমাত্রার শব্দে তারা অল্পতেই  উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

  • অতিরিক্ত জেদি বা রাগী হওয়া

নিজেদের পূর্নাঙ্গভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম হবার কারণে অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে বারাবাড়ি রকমের জেদ বা রাগ দেখা যায়।         

   

বাচ্চাদের মধ্যে অটিজম সিন্ড্রোমের প্রাথমিক লক্ষণ; Image Source: istockphoto.com

বাংলাদেশের অটিজম এ আক্রান্ত শিশুদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, বাংলাদেশে মেয়েদের থেকে ছেলেদের অটিজম এ আক্রান্ত হবার হাড় বেশী।প্রতি চারজন অটিজম শিশুর মধ্যে তিনজন ছেলে আর একজন মেয়ে।বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৯ সালের হিসেব অনুযায়ী এইদেশে অটিজম এ আক্রান্ত শিশুর  সংখ্যা ৪৭,৬০০ জন।এছাড়াও মোট মানসিক প্রতিবন্ধির সংখ্যা প্রায় ১০,৪৬০,০০ যার মধ্যে প্রায় ১০,০০০,০০ জন সরকার কর্তৃক অনুদান প্রাপ্ত।

অটিজম একটি মানসিক ব্যাধি।এতে আক্রান্ত শিশুর এর উপর কোন হাত নেই, এটা নেহাতিই তার এবং তার পরিবারের জন্য দূর্ভাগ্য।কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা অটিজম এর প্রতি একরকম নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করি।এরজন্য আমরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করি পরিবারকে,পরিবার দায়ী করে শিশুর মাকে।যদিওবা এইক্ষেত্রে মা কিংবা বাবা উভয়ের “জিন” ই দায়ী থাকতে পারে।এই দোষ আরোপের খেলায় সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয় শিশু।সে হয় অবহেলিত হয় অবাঞ্চনার শিকার।অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাকে গ্রহন করতে অস্বীকার করে তবে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা মা উভয়েই তাকে গ্রহনে অস্বীকৃতি জানায়।  জন্মের পূর্বে এবং পরে সন্তান সবচেয়ে বেশী নির্ভরশীল হয় মায়ের উপর ।তাই যখন কোন শিশু অটিস্টিক হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে তার মায়ের উপর নির্ভরতা থাকে সবচেয়ে বেশী।এক্ষেত্রে মায়েরা যদি সচেতন হন তবে তারা তাদের শিশুদের জন্মেরপর খুব দ্রুতই অটিজম এর উপসর্গ গুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হবেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।একটি অটিস্টিক শিশুর যদি সঠিকভাবে দেখাশোনা করা হয় এবং শিশুটির সঠিক ডায়াগনোসিস এর ব্যবস্থা করা হয় তবে শিশুটিকে শতভাগ না হলেও এর কাছাকাছি একটি স্বাভাবিক জীবন দেওয়া সম্ভব হয়।                  

এছাড়াও শিশুর  জন্মের পূর্বে যদি তারা নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হন সেটা হউক শারীরিক অথবা মানসিক এবং শিশুর সঠিক বিকাশের কথা চিন্তা করে যদি তারা তাদের কোন প্রকার আসক্তি সেটা হউক কোন প্রকার ড্রাগস বা নেশা জাতীয় কিছু সেটাথেকে নিজেকে দূরে রাখেন তবে অনেকাংশেই এই রোগের প্রতিরোধ করা সম্ভব।                                       

অটিজম এ আক্রান্ত শিশুর সব দায়িত্ব আমরা মায়ের উপর চাপিয়ে দেই কিন্তু এক্ষেত্রে শিশুর পরিবারের উপরও অনেক দায়িত্ব বর্তায়।মা বাবার পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও যদি শিশুর প্রতি কোমল আচরণ করে, শিশুর মা বাবাকে সবরকম সহযোগিতা প্রদান করে সাহস প্রদান করে তবে শিশুর মা বাবার সামনের জীবন যুদ্ধটাও অনেক সহজ হয়ে যায়।

                                

অটিজম রোগের উপশম গুলো বিভিন্ন রোগীর মধ্যে বিভিন্নভাবে দেখা যায়।তাই এই রোগের নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই।রোগের উপসর্গ অনুযায়ী রুগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে।তবে অটিজম রোগের চিকিৎসার মূলত দুটো ধাপ থাকে;

প্রথম ধাপঃ রুগীর আচরণ গত সমস্যাগুলো আইডেন্টিফাই করা এবং তা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং প্রদান করা।

দ্বিতীয় ধাপঃ রুগীর মানসিক সমস্যা গুলো চিহ্নিত করা।রুগী যদি হাইপারটেনশন বা এনসাইটিতে ভুগে থাকে তবে তাকে যথাযথ মেডিকেশন প্রদান করা।         

অটিজম সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে ইউ.এন(ইউনাইটেড নেশানস) ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ভাবে অটিজম ডে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।তখন থেকে প্রতিবছর ২’রা এপ্রিল বিশ্বব্যাপী অটিজম ডে পালিত হয়ে আসছে।এখন বিশ্বব্যাপী মানুষ অটিজম সম্পর্কে সচেতন এবং তারা অটিজম এ আক্রান্ত শিশুদের সাহস এবং ভালোবাসার সাথে গ্রহণ করছে।তাদেরকে গড়ে তুলছে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অবহেলিত হিসেবে নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *