5e1f119949364

ক্যান্সার বা কর্কটরোগ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। মূলত কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই হলো ক্যান্সার। এই রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পড়ে না, ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে চিকিৎসায় অনেক সময় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়ন। বাস্তবিক অর্থে এখনও পর্যন্ত ক্যান্সারের চিকিৎসায় পুরোপুরি কার্যকর কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয় নি। ক্যান্সার সারানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে এই রোগ সারানোর সম্ভাবনা অনেকাংশ বেড়ে যায়। ২১০ প্রকারেরও বেশি ক্যান্সার রয়েছে যার প্রত্যেকটিই আলাদা আলাদা এবং এদের চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্ন।

 

ক্যান্সার কী ?

মানবদেহ সহ সকল প্রাণীর শরীর অসংখ্য ছোট ছোট কোষের মাধ্যমে তৈরি। এই কোষগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মারা যায়। এই পুরনো কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ এসে জায়গা করে নেয়। সাধারনভাবে কোষগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং নিয়মমতো বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয়। কিন্তু যখন এই কোষগুলো কোনও কারণে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে তখনই ত্বকের নিচে মাংসের দলা অথবা চাকা দেখা যায়। একেই টিউমার বলে। এই টিউমার বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকেই ক্যান্সার বলে।

ম্যালিগন্যান্ট টিউমার; Images Source : Getty Images

তবে বিনাইন টিউমার ক্যান্সারে পরিবর্তিত হবেই তার কোন আবশ্যকতা নেই।কিছু ক্ষেত্রে বিনাইন টিউমার চাপ দিয়ে আশেপাশের কলার ক্ষতি করতে পারে।এপর্যায়ে,, ক্যান্সার কোষগুলি অন্যান্য কলাকে ভেদ করে ও রক্ত, লসিকাতন্ত্র (Lymphatic System) ইত্যাদির মাধ্যমে দূরবর্তী কলায় ছড়িয়ে যায়।একে বলা হয় মেট্যাস্টাসিস।

ক্যান্সারের কারন

বাস্তবিক অর্থে এ রোগের কারন নির্নয় এখনো সম্ভব হয়নি। যদিও এ নিয়ে বর্তমান বিশ্বে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। সাধারণত বয়স যত বাড়তে থাকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে, কারণ এ সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এক হিসেবে দেখা যায় যত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তাদের শতকরা ৭০ ভাগেরই বয়স ৬০ বছরের ওপর।

তবে ক্যান্সারের ধরন ভেদে এর প্রাথমিক কিছু কারন নির্নয় করা হয়েছে

ত্বকের ক্যান্সার

ত্বকের ক্যান্সার বর্তমানে প্রায় দেশেই লক্ষ্য করা যায়। এর জন্য কিছু বিষয়কে দায়ী করা হয়। যেমনঃ

রোদে অতিবেগুনি রশ্মি থাকে, যা ত্বকের ক্যান্সারের প্রধান কারণ। বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরে রোদে বেশি থাকলে ত্বকের ক্যান্সার হবার ঝুঁকি বেশি থাকে।

ভেজাল কসমেটিকস্দী র্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলেও ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে পেশাগত (রেডিয়োলজি টেকনেশিয়ান) বা অন্য কোনো কারণে দীর্ঘদিন তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের ক্যান্সার হয়।

শ্বেতাঙ্গ- যাদের লাল চুল ও নীল বা ধূসর চোখ থাকে এবং যাদের ত্বকে ৫০ বা ততোধিক তিল থাকে তাদের ত্বকের ক্যান্সার বেশি হবার সম্ভাবনা থাকে।

কোনো স্থানে রোদ যত কড়া সেই স্থানের বাসিন্দাদের ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। চিকিৎসা বা সানবাথের জন্য বেশি প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম অতিবেগুনি রশ্মির ব্যবহার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। কারো যদি পরিবারে ত্বকের ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে তবে তার ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

দীর্ঘদিনের অবহেলিত ত্বকের ঘা, পোড়া, ক্ষত, চর্মের যক্ষ্মা ইত্যাদিতে ক্যান্সার হতে পারে। কিছু জন্মগত বা বংশগতির চর্মরোগ; যেমন- জেনোডার্মা পিগ্মেন্টোসা। দীর্ঘদিন মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি খেলে ত্বকের এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্যান্সার (যেমন- ফুসফুস, লিভার, মূত্রথলি) হয়।

ত্বকের ক্যান্সার ; Images Source : Getty Images

প্রতিরোধে করনীয়ঃ

ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। যেমনঃ

সৌর আলোক থেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত থাকতে হবে। বিশেষ করে দিনের মধ্য ভাগে (সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা) ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না বা বাইরে গেলেও ছায়ায় থাকতে হবে। বালি, পানি, বরফ ইত্যাদি থেকে প্রতিফলিত হয়ে যে সৌর আলোক আসে তা থেকেও ত্বক বাঁচিয়ে চলতে হবে। ঘন বুননের কাপড়, লম্বা প্যান্ট এবং ফুল হাতা শার্ট পড়তে হবে। রোদে গেলে মাথায় ছাতা অথবা এমন হ্যাট পরবে, যার চারদিকে যথেষ্ট বাড়তি অংশ থাকে যাতে মুখমণ্ডল, কান ও গলায় ছায়া থাকে।

রোদে গেলে শরীরের খোলা স্থানে সানস্ক্রিন মাখতে হবে। সূর্যালোকে যাবার অন্তত ৩০ মিনিট আগে এসপিএফ ১৫ (বা তারও বেশি) সমৃদ্ধ সানস্ক্রিণ মাখুন। লক্ষ্য রাখতে হবে ত্বকে কোনো নতুন তিল উদয় হয় কি না অথবা পুরনো তিলে হঠাৎ রং, আকার বা ওপরিভাগে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না। অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যদি কেউ আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত থাকে তবে ত্বকের যেকোনো সন্দেহজনক গোটা বা দাগ চিকিৎসককে দেখিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হব।

যে কোনো প্রকারের ভেজাল কসমেটিকস্ বা অতিরিক্ত মাত্রায় কসমেটিকস্ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত।

ত্বকের ক্যান্সার ; Images Source : Getty Images

স্তন ক্যান্সারঃ

মহিলাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে বেশি। আমাদের দেশে যতো নারী ক্যান্সার আক্রান্ত হন, তার বেশির ভাগই স্তন ক্যান্সার। মূলত বয়স যত বৃদ্ধি হতে থাকে, স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ততোই বাড়তে থাকে। অল্প বয়সের মহিলাদের চেয়ে বয়স্ক মহিলাদের বিশেষ করে ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মহিলাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।এর যে সকল কারন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলোঃ

  1. পূর্বে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে: যদি কারো পূর্বে একটি স্তনে ক্যান্সার হয়ে থাকে, তবে তার অন্য স্তনেও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  2. পরিবারে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে: যদি কারও মা, বোন অথবা মেয়ের স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকে তবে তার স্তনে ক্যান্সারের আশঙ্কা অনেক গুণ বেশি। তবে স্তন ক্যান্সার ধরা পড়েছে, এমন ব্যক্তিদের অধিকাংশরই কোনো পারিবারিক ইতিহাস নেই।
  3. শিশু অথবা তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক তেজস্ক্রিয়/বিকিরণ রশ্মি দিয়ে চিকিৎসা করলে পরবর্তী জীবনে তার স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে।
  4.  মাত্রাতিরিক্ত ওজন (অথবা মোটা) স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। চর্বি ইস্ট্রোজেন হরমোন উৎপাদন করে, যা ক্যান্সারের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
  5. .১২ বছর বয়স হওয়ার আগে ঋতুস্রাব হলে তা স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
  6. ৫৫ বছর বয়সের পর যদি মেনোপজ হয়, তা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  7.  ৩৫ বছরের পরে যদি কোনো মহিলা প্রথম সন্তান জন্ম দেয় তবে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়
  8. ঋতুস্রাবের লক্ষণ ও উপসর্গ সমূহের জন্য যেসব মহিলা ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরনে মিলিত হরমোনের চিকিৎসা নেন, তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে।
  9. মদ্যপান: অতিরিক্ত মদ্যপানও অনেক সময় স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  10. বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো ও এ রোগের একটি অন্যতম কারন।

প্রতিরোধে করনীয়ঃ

সারা বিশ্বে নারীমৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো স্তন ক্যান্সার। প্রতি ৮ জন মহিলার মধ্যে একজনের স্তন ক্যান্সার হতে পারে এবং আক্রান্ত প্রতি ৩৬ জন নারীর মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা একজনের।প্রতি ৬ মিনিটে একজন নারী এতে আক্রান্ত হয় এবং প্রতি ১১ মিনিটে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন নারী মারা যায়।

কিন্তু এতকিছুর পর ও আমাদের সমাজে স্তন ক্যান্সার নিয়ে রয়েছে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব। আর এই সচেতনতার অভাবে অনেকেরই একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে আর তখন তেমন কিছুই করার থাকে না। অথচ ঘরে বসেই সহজে একজন নারী তার স্তন পরীক্ষা করে নিতে পারেন। এতে স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়েই নির্ণয় করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব হলে এর সফলতার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

ঘরে বসেই যেভাবে স্তন পরীক্ষা করা যায়

গোসলের সময় ভেজা চামড়ার উপর আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে চেপে চেপে দেখতে হবে। বাঁ দিকের স্তনের জন্য ডান হাত ও ডান দিকের স্তনের জন্য বাঁ হাত ব্যবহার করতে হবে। দেখতে হবে কোনো চাকা, গুটি বা শক্ত দলার মতো কিছু অনুভূত হয় কি না।

প্রথমে হাত দু’পাশে থাকবে,তারপর হাত দুটি সোজা করে মাথার উপর তুলতে হবে। এবার সতর্কভাবে লক্ষ্য করে দেখতে হবে যে, স্তনবৃন্ত বা অন্য কোনো অংশ ফুলে আছে কি না অথবা কোনো অংশে লালচে ভাব বা টোল পড়া অংশ আছে কি না।

এবার কোমরে হাত দিয়ে কোমরে চাপ দিতে হবে। এখন ডান ও বাম স্তন দুটোই ভালোভাবে দেখতে হবে। কোনোরকম অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়ে কি না। তবে এক্ষেত্রে বলে রাখা প্রয়োজন, খুব কম নারীরই দুটো স্তন দেখতে একই রকম হয়। প্রতিনিয়ত এই পরীক্ষা করলে স্তনের স্বাভাবিক অবস্থা বোঝা যাবে ও অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন হলে তা চোখে পড়বে।

মাটিতে অথবা বিছানায় চিত হয়ে শুতে হবে। এরপর ডান স্তন পরীক্ষার জন্য ডান দিকে ঘাড়ের নিচে একটি বালিশ বা ভাঁজ করা কাপড় দিয়ে উঁচু করতে হবে এবং ডান হাত মাথার পেছনে রাখতে হবে। এবার বাম হাতের আঙুলগুলো চ্যাপ্টা করে ডান স্তনের উপর রাখতে হবে।

ঘড়ির কাঁটা ঘোরার দিকে চক্রাকারে হাত ঘোরানো শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে বলে রাখা জরুরি, স্তনের নিচের অংশ কিছুটা শক্ত মনে হতে পারে। এটা স্বাভাবিক বিষয়। এভাবে চক্রাকারে হাত ঘুরে আসার পর স্তনবৃন্তের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এক ইঞ্চি অগ্রসর হবার পর একইভাবে চক্রাকারে আবার স্তন পরীক্ষা করতে হবে।
সবশেষে স্তনবৃন্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মধ্যে ধরে চাপ দিতে হবে এবং দেখতে হবে কোনো কিছু নিঃসরিত হয় কি না।

এই পরীক্ষাগুলো করবার সময় যদি স্তনে কোনো ধরনের শক্ত চাকা, গোটা বা দলা অনুভূত হয় অথবা স্তনের বোঁটা হতে কিছু নিঃসরিত হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এভাবে মাসে অন্তত দুবার ঋতুচক্রের নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যেক নারীর স্তন পরীক্ষা করা উচিত। নিয়মিতভাবে নিজের স্তনের যেকোনো অস্বাভাবিক চাকা বা টিউমার শনাক্ত করার জন্য হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখার এই পদ্ধতিকে বলা হয় সেলফ ব্রেস্ট এক্সাম। এই সেলফ ব্রেস্ট এক্সামই পারে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো যায়। এই সহজ নিয়মগুলো হলো-

  1. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিশেষত, স্থূলতার সাথে স্তন ক্যান্সারের একটি যোগসূত্র রয়েছে।
  2. প্রত্যেক নারীরই প্রতিদিন আধঘণ্টা ব্যায়াম অথবা কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত।
  3. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে। সবজি জাতীয় খাবার যেমন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ফলমূল ইত্যাদি খাবার বেশি খেতে হবে। এ ধরনের সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়ানো যায়।
  4. অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হবে।

স্তন ক্যান্সার কোনো লজ্জার বিষয় নয় বা কোনো গোপন রোগ নয়। প্রতি ৬ মিনিটে একজন নারী ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।আমাদের সকলের সচেতনতাই পারে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে।

লিভার ক্যান্সারঃ

সারা পৃথিবীতেই লিভার ক্যান্সার, ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ লোক এ রোগে আক্রান্ত হন। পুরুষদের ক্ষেত্রে মোট ক্যান্সারের ৭.৫ ভাগ লিভার ক্যান্সার, আর নারীদের বেলায় এ সংখ্যাটি ৩.২ ভাগ। আশংকাজনক সত্যটি এই যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় লিভার ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব পৃথিবীর অন্য যে কোন অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশী।

বিশ্বব্যাপী লিভার ক্যান্সারের মুল কারণ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস আর অ্যালকোহল। আমাদের দেশে অবশ্য হেপাটাইটিস বি মুল কারন,,কেননা এদেশে প্রায় ৮০ লাখ লোক এ ভাইরাসের বাহক।

লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাব্য কারনঃ

  1. দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া এবং দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা দুটোই লিভার নষ্টের কারণ। এতে শারীরিক সাইকেলের ব্যাঘাত ঘটতে থাকে এবং তার মারাত্মক বাজে প্রভাব পরে লিভারের উপরে। অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠেও আলসেমি করে প্রস্রাবের বেগ হলেও বাথরুমে না গিয়ে তা চেপে শুয়েই থাকেন। এতে লিভারের উপরে চাপ পড়ে এবং লিভার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারায়।
  2. অতিরিক্ত বেশি খাওয়া লিভারের পক্ষে ক্ষতিকর।আবার বহুক্ষণ সময় না খেয়ে একবারে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন। এতে হঠাৎ করে লিভারের উপর চাপ বেশি পরে এবং লিভার ড্যামেজ অতিরিক্ত বেশি খাওয়া লিভারের পক্ষে ক্ষতিকর।আবার বহুক্ষণ সময় না খেয়ে একবারে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন। এতে হঠাৎ করে লিভারের উপর চাপ বেশি পরে এবং লিভার ড্যামেজ হওয়ার আশংকা থাক।
  3. সকালের খাবার না খাওয়া লিভারের পক্ষে ক্ষতিকর। অনেকটা সময় পেট খালি থাকার কারণে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাশাপাশি খাদ্যের অভাবে কর্মক্ষমতা হারাতে থাকে লিভারও।
  4. অনেক বেশি ঔষধ খেলে লিভার নষ্ট হয়। বিশেষ করে ব্যথানাশক ঔষধের জেরে লিভারের কর্মক্ষমতার হ্রাস পায়ে। এছাড়াও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতি হয় লিভারের। এতে করে লিভার ড্যামেজ হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়।
  5. কেমিক্যাল সমৃদ্ধ যেকোনো কিছুই লিভারের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন্তু মুখের স্বাদের জন্য অনেকেই প্রিজারভেটিভ খাবার, আর্টিফিশিয়াল ফুড কালার, আর্টিফিশিয়াল চিনি ইত্যাদি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলে যা লিভার নষ্টের অন্যতম কারণ।
  6. খারাপ তেল ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার লিভারের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। একই তেলে বারবার ভাজা খাবার বা পোড়া তেলের খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া হলে লিভার তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে থাকে।
  7. অতিরিক্ত কাঁচা খাবার খাওয়াও লিভারের জন্য ক্ষতিকর। যেমনঃ যদি খুব বেশি কাঁচা ফলমূল বা সবজি খাওয়া হয়,,তাহলে তা হজমের জন্য অতিরিক্ত কাজ করতে হয় পরিপাকতন্ত্রের। এর প্রভাব পড়ে লিভার এর উপর।
  8. অতিরিক্ত পরিমাণে মদ্য পান করা লিভার নষ্টের আরেকটি মূল কারণ। অ্যালকোহলের ক্ষতিকর উপাদান সমূহ লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে।

ব্লাড ক্যান্সারঃ

মূলত লিউকেমিয়াকে আমরা ব্লাড ক্যানসার বলে থাকি। এটি হলো রক্তকোষের ক্যানসার, বিশেষত শ্বেত রক্তকণিকার ক্যানসার। রক্তকোষ তৈরি হয় বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জায়, তারপর ধাপে ধাপে পরিপক্ব বা পরিণত হয়ে অবশেষে এটি রক্তে আসে। যদি কোনো কারণে অতিমাত্রায় ও অস্বাভাবিকভাবে এই রক্তকোষ তৈরি হয়, তাহলে সেগুলো পরিপক্ব হতে পারে না। এতে প্রচুর অপরিপক্ব ও অস্বাভাবিক রক্তকোষ রক্তপ্রবাহে চলে আসে। মূলত শ্বেত রক্তকণিকাই বেশি আক্রান্ত হয়। কিন্তু ক্রমে অস্থিমজ্জা পুরোপুরি আক্রান্ত হওয়ার কারণে রক্তের অন্যান্য কোষের অভাবও দেখা দেয়।

ব্লাড ক্যান্সারের কারনঃ

আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ৪ থেকে ৫ জন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সে হিসাব অনুযায়ী ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে প্রতিবছর ৬-৭ হাজার লোক আক্রান্ত হচ্ছেন। ব্লাড ক্যানসার কেন হয় তার সঠিক কারণটি এখনো অস্পষ্ট। নানা ধরনের তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব, রাসায়নিক বর্জ্য, ধূমপান, কৃত্রিম রং, কীটনাশক, ভাইরাস ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়। এগুলোর প্রভাবে জিনে মিউটেশন ঘটে যায় ও কোষ বিভাজনে অস্বাভাবিক উল্টাপাল্টা সংকেত প্রবাহিত হয়। তখন কোষ বিভাজনে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, অপরিণত অস্বাভাবিক কোষ রক্তপ্রবাহে চলে আসে। ব্লাড ক্যানসার ছোঁয়াচে বা সংক্রামক নয়। ব্লাড ক্যানসার ছোট–বড় যে কারও হতে পারে।

  1. কৃষি কাজে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা।
  2. কলকারখানায় নিরাপত্তাহীন পরিবেশে কাজ করা
  3. বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ দূষণ
  4. বংশের কারো যদি History থাকে

 

প্রতিরোধের উপায়ঃ

যেহেতু এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো কারন নির্নয় সম্ভব হয়নি তাই,, এর সুস্পষ্ট কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্হাও নেই।তবে বিশেষজ্ঞগন কিছু বিষয়কে প্রতিরোধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যেসব রোগীকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি একসঙ্গে দেয়া হয় তাদের মধ্যে বস্নাড ক্যান্সারের প্রবণতা প্রায় ২০ গুণ বেড়ে যায়।

  1. সকল ধরণের তেজস্ক্রিয়তা পরিহার করতে হবে।
  2. রাসায়নিক দ্রব্যাদির সংস্পর্শ পরিহার করতে হবে।
  3. এক্স-রে বিভাগে ও নিউক্লিয়ার বিভাগের কাজ করার সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
  4. ধূমপান ও তামাক জর্দা পরিহার করতে হবে।

ব্লাড ক্যান্সার নির্ণয়ঃ

  1. বোনাম্যারো ও ট্রিফাইন বায়োপসি পরীক্ষা: কোমরের হাড় থেকে অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করে পরীক্ষা।
  2. লিমফোনোড এফএনএসি ও বায়োপসি পরীক্ষা: লসিকা গ্রন্থি থেকে টিস্যু নিয়ে পরীক্ষা।

আধুনিক চিকিৎসাঃ

  1. কেমোথেরাপি ৷
  2. বোনম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশন (মেরুমজ্জা প্রতিস্থাপন)
  3. টার্গেট থেরাপি।
  4. ইমিউনো বা বায়োলজিক্যাল থেরাপি।

 

এছাড়াও আরো বিবিধ প্রকারের ক্যান্সার রয়েছে,,,তবে আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই গুলোই বেশি দেখা যায়।এই মরন ব্যাধি নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচুর পরিমানে গবেষণা হচ্ছে,, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য ও অর্জিত হয়েছ,,, তবে সর্বোপরি বিষয় হচ্ছে যেহেতু এখন পর্যন্ত এ রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট কারন আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নি তাই,, নিজেদেরকে সচেতন হতে হবে।

দৈনন্দিন জীবনে সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে যেমনঃ সকালে ওঠা,, নিয়মিত ব্যায়াম বা পরিশ্রম করা। সময় মতো সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। সেই সাথে ভেজাল খাবার বা বাইরের অপরিচ্ছন্ন খাবার বা junk food বা fast food এর থেকে বিরত থাকা ইত্যাদ।

যদি ক্যান্সারের কোনো লক্ষ্মণ বলে মনে হয় বা সন্দেহ হয় তখন দ্রুততার সাথে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হব।

Source : ডেভিডসন মেডিসিন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *