5e25f8665c3d5

‘পোষ্য গ্রহণ’ বা ‘দত্তক’ এমন এক সামাজিক প্রক্রিয়া যার আওতায় একটি শিশুর লালন পালনের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব তার জৈব মা-বাবার পরিবর্তে দত্তকগ্রাহী মা-বাবার হয়ে দাড়ায়। বিশ্বের নানা দেশ ও সংস্কৃতিতে দত্তক দেয়া নেয়ার বহুল প্রচলন রয়েছে। 

পোষ্য গ্রহনের মাধ্যমে একটা অনাথ শিশুকে অন্য কোনো পরিবারে সর্বোত্তম নিরাপত্তা ও পারিবারিক সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয়া হয়। ঐতিহ্যগতভাবে, অজানা কোনো পরিবারের পরিবর্তে ঘনিষ্ঠতর কেউ শিশুর দায়িত্ব নিলে, সেটা আরও সুব্যবস্থা বিবেচিত হয়। এ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদী পোষ্য নেয়ার সামিল ধরা হয়, যার দ্বারা শিশুর নিজস্বজনের কাছে লালিত পালিত হবার যে অধিকারের কথা বলা হয়, সেটাও রক্ষিত হলো ধরে নেয়া যায়।

বাংলাদেশের যখন জন্ম হয় ১৯৭১ সালে, দণ্ডবিধি অনুসারে দত্তক দেয়া অথবা নেয়া ও দত্তক নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আইন চালু ছিলো না। এ বিষয়ে পূর্বে প্রণীত আইন Guardian and Ward Act,1890 এবং Muslim Family Ordinance, 1911 বাংলাদেশেও বর্তায়। এ আইন অনুসারে উপযুক্ত আদালত অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর দেখাশোনার ভার শিশুর সর্বোচ্চ মঙ্গলের স্বার্থে যে কারো ওপর ন্যস্ত করতে পারে। মুসলমান আইনে দত্তক নেবার ব্যবস্থা নেই, যেরকম পশ্চিমে আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। মৃত্যু, অসুস্থতা এবং অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতার কারণে শিশুদের মা-বাবার কাছ থেকে অভিভাবকত্ব সরিয়ে শিশুর বর্ধিত পরিবারের অন্য কারো ওপর অথবা কোনো নিকট আত্মীয়ের ওপর অথবা অনাথ আশ্রম অথবা ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ দিতে পারে। 

উল্লেখ্য যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিদেশিরা যাতে যুদ্ধশিশুদের সহজে দত্তক নিতে পারে সে লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ পরিত্যক্ত শিশু (বিশেষ বিধান) আদেশ ১৯৭২’ নামে রাষ্ট্রপতির একটি আদেশ জারি করা হয়েছিলো। সেসময় দুটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান – বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর উইমেন রিহ্যাবিলিটেশন এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা সমিতি এ বিষয়ে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে একত্রে কাজ করেছিলো।কানাডার বিভিন্ন পরিবারে দত্তক হিসাবে দেওয়ার জন্য ১৫টি যুদ্ধশিশুকে কানাডায় নিয়ে যাওয়া হয় ১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই। পুরান ঢাকায় মিশনারিজ অব চ্যারিটির শিশু ভবন থেকে ১৫টি যুদ্ধশিশু নয়াদিল্লি ও নিউইয়র্ক হয়ে টরেন্টো পৌছায়, যাতে সময় লেগে যায় প্রায় দুইদিন।

Image Source :Rokomary.com

গবেষক মুস্তফা চৌধুরী ওই যুদ্ধশিশু এবং তাদের দত্তক গ্রহীতাদের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তার গবেষণা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘৭১ এর যুদ্ধশিশুঃ অবিদিত ইতিহাস‘ গ্রন্থ। মুস্তফা চৌধুরি জানান,কানাডায় ওই যুদ্ধশিশুরা ভালোই আছেন, তারা তাদের আত্মপরিচয় সম্পর্কেও জানেন। বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের প্রথম যে দলটিকে দত্তক নেয়া হয়েছিলো, তাদেরই একজন রায়ান গুড। কানাডা থেকে বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের একটি দল জন্মভুমিতে ফিরে আসে ১৯৮৯ সালে। বাংলাদেশে সপ্তাহকাল অবস্থান করে তারা। রায়ান তখন ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ ও সম্পদ বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। 

 

 

কানাডায় বেড়ে ওঠা আরেক যুদ্ধশিশু রানী। রানী যখন তার জন্মবৃত্তান্ত জানতে পারেন তখন থেকেই পরিচয়হীনতাই ভুগতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যান এবং আত্মহত্যা করেন।

কানাডায় প্রতিপালিত আরেক দত্তক শিশু অনিল। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে ক্যান্সার কেয়ার ইউনিটে চাকরি করেন। 

আরেক যুদ্ধশিশু কোহিনূর থাকেন নরওয়েতে। কোহিনূর সংগীতশিল্পী হিসেবে নরওয়েতে বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। 

এভাবে সারাবিশ্বে বিভিন্ন শহরে বেড়ে উঠেছে যুদ্ধশিশুরা, তবে এদের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের একটি বিতর্কিত দিকও ছিলো। পশ্চিমের  দত্তক গ্রহনকারী সংস্থাগুলো যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনে বেশ আগ্রহ দেখায়, কিন্তু তাদের জন্মদাত্রী মায়েদের পুনর্বাসনে তেমন আগ্রহ দেখায় নি। যুদ্ধশিশুদের অধিকাংশই ছিলো মুসলিম মহিলাদের সন্তান এবং তারা দত্তক গ্রহনকারী দেশগুলোতে  খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে উঠবে জেনে বাংলাদেশের জনমত এই আন্তঃদেশীয় উদ্যোগের প্রতি বিরুপ হয়ে ওঠে। 

১৯৮২ সালের ‘Guardian and Ward Assessments ‘ অনুযায়ী বাংলাদেশি শিশুদের অভিভাবকত্ব শুধুমাত্র বাংলাদেশি বাবা-মাকে দেয়া হয়।

পৃথিবীর সব দেশেই সন্তানহীন পরিবার থাকে। সেসব পরিবার সাধারণত পালনের জন্য অন্যের সন্তান গ্রহণ করে থাকে। এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ, প্রত্যেকেরই সন্তানের কামনা থাকে। বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ হওয়ার কারণে এখানে অসহায় শিশুর সংখ্যা অনেক। এসব শিশুর অনেককেই সন্তানহীন পরিবার পালনের জন্য গ্রহণ করে থাকে। অনেক পরিবার মানবিক দায়িত্ব মনে করেও এ ধরনের দু-একজন শিশুকে মানুষ করে থাকে। অনেকেই গরীব আত্মীয়স্বজনের সন্তানকেও পালনের জন্য গ্রহণ করে থাকে। অনেক সময় দু-একদিনের শিশুকে পথে পাওয়া যায়। বিশেষ করে অবৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে যেসব শিশু জন্মগ্রহণ করে তাদেরকে পথে রেখে দেয়া হয়, এই ভেবে যে কেউ না কেউ তাকে তুলে পালবে। প্রকৃতপক্ষেই অনেক সহৃদয়বান ব্যক্তি তাদের তুলে নিয়ে মানুষ করে থাকেন। এসব শিশুকে উদ্ধার করার জন্য সামাজিক ব্যবস্থাও থাকা উচিত। এসব অল্প বয়স্ক শিশু রক্ষা করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এজন্য প্রত্যেক হাসপাতালে ও এতিমখানায় বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিত।

(Photo by Allison Joyce/Getty Images)

সর্বোপরি, শুধু সন্তানের জন্ম দিয়েই মা-বাবা হওয়া যায় না। এটা দত্তক নেয়া শিশুদের মা-বাবাদের দেখলেই বোঝা যায়। একজন শিশু যার কোনো ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা ছিলো না, তাকে আদরে যত্নে শিক্ষায় বড় করে মানুষের মতো মানুষ করে তুলছেন এই সন্তানহীন মা-বাবারা। তাদের মাতৃত্ব যেকোনো স্বাভাবিক মায়ের থেকে কোনো অংশে কম নয়।

Zannatun Naim Monika

BY:

[email protected]

আমি মনিকা। বসবাস পাবনাতে। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স মাস্টার্স করেছি।...

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *