5e32ac878178f

ডায়েট শব্দটার সাথে স্থুলকায় মানুষ গুলো বেশি পরিচিত। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ ই স্বাস্থ্যসচেতন। নিজেদের কে ডায়েট এর মধ্যে রাখতে পছন্দ করেন। আবার কেউ আছেন ডায়েট কি সেটাই বুঝেন না।  অনেকেই না খেয়ে থাকা কে ডায়েট মনে করেন। আসলেই কি তাই? মোটে ও তা নয়।গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষ ডায়েট নিয়ে বেশি ভেবে থাকেন। নিজেকে ডায়েটের মধ্যে রেখে সুস্থ থাকার প্রয়াস চালায় অনেকেই। 

যারা এই প্রয়াস চালাচ্ছেন অর্থাৎ ডায়েট করছেন আসলেই কি স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েট করছেন? নাকি সারাদিন নিজেকে ক্ষুধার্ত রেখে ডায়েট বলে চালিয়ে দিচ্ছেন? যদি এমন হয় তাহলে আমি বলব আপনি ভূল করছেন এবং নিজের শরীরে রোগ বাধানোর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন। আপনি কি ডায়েট করার কথা ভাবছেন? ডায়েট করতে চান কিন্তু করা হচ্ছে না? বুঝতেই পারছেন না আসলে ডায়েট কি? আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর পেতে সংগেই  থাকুন। 

ডায়েট কি?  

রবার্ট  এটকিনস -এর ডায়েট সম্পর্কিত প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। এর পর থেকে মানুষ ডায়েট শব্দটির সাথে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচিত হয়। 

নিজেকে ডায়েট এর মধ্যে রাখতে হলে আগে জানতে হবে ডায়েট কি।  প্রচলিত ধারণা রয়েছে নিজেকে খাদ্য থেকে দূরে রাখার নাম ডায়েট। যা সত্যি নয়। পরিমাণমত সুষম পুষ্টিযুক্ত খাবার গ্রহনের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ- এর কর্মক্ষমতা সচল রাখাকে ডায়েট বলে। 

রবার্ট  এটকিনস -এর ডায়েট সম্পর্কিত প্রথম বই: Image Source: creativeyoke.com

ডায়েট – এর ধরনঃ

আপনি কি জানেন বিভিন্ন উপায়ে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার খাওয়ার  মাধ্যমে আপনি ডায়েট করতে পারবেন? চলুন দেখে নেওয়া যাক- 

১। কিটো ডায়েট 

২। লিকুইড ডায়েট

৩। হাই প্রোটিন ডায়েট

 

কিটো ডায়েট এর উৎপত্তি কিভাবে? 

মৃগরোগের চিকিৎসার সুবাদে ১৯২০ সালে কিটোজেনিক ডায়েট এর উৎপত্তি হয়। পরক্ষণে এ রোগের ঔষধ আবিষ্কার হওয়ায় এই ডায়েট এর জনপ্রিয়তা কমে যায়।মানব দেহের শক্তির প্রদান উৎস হল গ্লুকোজ। 

যদি শরীরে গ্লুকোজের ঘাটতি দেখা যায় তবে মানবদেহ বিকল্প উৎস ব্যবহার করে। এই বিকল্প উৎস কে বলা হয় কিটোনবডি। এই কিটোনবডি থেকেই এসেছে কিটো ডায়েট। 

কিটো ডায়েট কি? 

যারা ডায়েট করেন তাদের কাছে কিটো ডায়েট অধিক গ্রহনযোগ্য। লো-কার্বযুক্ত খাবার গ্রহনের মাধ্যমে ডায়েট করাকে কিটো ডায়েট বলে। এই ডায়েটে কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন এবং চর্বিজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়। যেমন আপনার খাদ্যতালিকায় ১০০% এর মধ্যে  প্রোটিন রাখতে হবে ২৫%, ফ্যাট ৭০% এবং কার্ব মাত্র ৫%। বলে রাখা ভালো কিটো ডায়েট ও বিভিন্ন ধরনের রয়েছে। নিম্নে আলোচনা করা হল –

++ স্ট্যান্ডার্ড কিটোজেনিক ডায়েটঃ

 এই ডায়েটে ফ্যাট ৭৫%, প্রোটিন ২৫% এবং কার্ব ৫% রাখতে হয়।

++ টারগেটেড কিটোজেনিক ডায়েটঃ

শরীরের কর্মক্ষমতার ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় প্রোটিন অঅর্ন্তভুক্ত করা হয়। 

++ সাইক্লিকাল কিটোজেনিক ডায়েট 

এ ডায়েটে সপ্তাহে সাতদিনের মধ্যে পাঁচদিন কার্বোহাইড্রেট  বাদ দিয়ে বাকি দুইদিন কার্বোহাইড্রেট নিতে হয়।

++ হাই প্রোটিন কিটো ডায়েটঃ

বডি বিল্ডার বা এথলেটরা এই ডায়েট অনুসরণ করে থাকে। এই ডায়েট এ প্রোটিন রাখতে হয় ৩৫%, ফ্যাট ৬০% আর কার্বোহাইড্রেট ৫%।

কিটো ডায়েট – এর খাদ্যতালিকাঃ

গরু, মুরগী, মাছ, ডিম, বাটার, পনির, দই, ঘি, বাদাম, সব ধরনের অয়েল, লাল-সবুজ শাক সবজি, পালং, ব্রকলি, বাধাকপি, ফুলকপি, লাউ, জলপাই, স্ট্রবেরি, লেবু, অ্যাভোকাডো খাওয়া যাবে।

যা  বাদ দিতে হবেঃ

মিষ্টিজাতীয় যে কোন জিনিস, আটার তৈরী খাবার, সব ধরনের ফল, ডাল, আলু, মুলা, গাজর, কচু বাদ দিতে হবে। 

সুবিধাঃ 

১। ব্রেইনে এনজাইম এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়। 

২। ব্লাডে সুগারের পরিমান ঠিক থাকে।

৩। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

 ৪। ত্বকে ব্রণের সমস্যা হ্রাস করতে

 সাহায্য করে।। 

 

কিটো সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শঃ   

খিলগাঁও, ঢাকার পিপলস হসপিটালের একজন পুষ্টিবিদ বলেন, কিটো ডায়েট এক টানা করা শরীরের জন্য ঠিক না। এ ক্ষেত্রে কোন ডায়েট চার্ট অনুসরণের আগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর পরামর্শ নিয়ে করা উচিত। 

 

অসুবিধাঃ 

১. ফাইবার কম। 

২. কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা হয়।

৩. কার্ব কম নেওয়ার কারনে মিনারেল এর ঘাটতি দেখা যায়।

৪. শরীরের এনার্জি কমে যায়।

৫. মাথা ঘোরা এবং কিডনিতে স্টোন হওয়ার মত রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

লিকুইড ডায়েট এর উৎপত্তি কিভাবে

বিভিন্ন ধরনের মেডিক্যাল টেস্ট, সার্জারির আগে রোগীকে তরল খাবারের খাদ্য তালিকা দেওয়া হয় যা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে ও সাহায্য করে। এই থেকেই লিকুইড ডায়েট এর সূচনা।

 লিকুইড ডায়েট কি?

লিকুইড ডায়েট ওজন দ্রুত কমাতে সাহায্য করে। তবে এক্ষেত্রে আপনার প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। কারন আপনাকে খাবার পানীয় – এর উপর নির্ভর করতে হবে। তরল খাবার গ্রহনের মাধ্যমে ডায়েট করাকে লিকুইড ডায়েট বলে।

লিকুইড ডায়েট এর ধরনঃ 

লিকুইড ডায়েট ও কয়েক রকমের হয়ে থাকে –

 ১. ডিটক্স লিকুইড ডায়েটঃ

ওজন নিয়ন্ত্রণে লিকুইড ডায়েট অনেক কার্যকরী সমাধান। এই ডিটক্স আপনি নিজেই তৈরি করতে পারবেন। একটা পানি ভর্তি কাচের পাত্রে কয়েক টুকরো যে কোন ধরনের ফল দিন। আপনার পছন্দ অনুযায়ী পুদিনা পাতা ও দিতে পারেন। তারপর সারারাত রেখে দিতে হবে। ২/৩ দিনের মধ্যে এই ডিটক্স শেষ করতে হবে। ভালো ফল পেতে সকাল বেলা খালি পেটে খেতে পারেন।

২. সুপ ডায়েটঃ

আমরা সাধারণত তিনবেলা খাবার গ্রহন করে থাকি। এ ডায়েট এর ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিনযুক্ত ফল বা সবজির রস খাওয়া যাবে।

লিকুইড ডায়েট এর খাদ্যতালিকাঃ

লিকুইড খাবার খেতে হবে। সব ধরনের ফলের রস, সবজির জুস, জেলি, মিল্ক শেক, পুডিং, আইসক্রিম, সোডা খাওয়া যাবে।

বাদ দিতে হবেঃ

এ ডায়েট করতে হলে আপনাকে সব শক্ত খাবার বাদ দিয়ে তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।

সুবিধাঃ  

১। পেট এবং অন্ত্রগুলি পরিষ্কার রাখে।

২। একমাস এই ডায়েট মেনে চললে শরীরে মেটাবলিজম এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় 

৩। শরীর বিষমুক্ত হয়। 

 ৪। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

অসুবিধাঃ 

১.শরীরের দুর্বল হয়ে যায়। 

২. সপ্তাহে ২/৩ দিনের বেশি এই ডায়েট অনুসরণ করা ক্ষতিকর হতে পারে। 

৩। শরীর থেকে প্রয়োজনীয় সোডিয়াম বেরিয়ে যায়। 

 ৪। মাত্রাতিরিক্ত ডিটক্স পান করলে  কিডনির উপর চাপ পড়তে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের  পরামর্শঃ  শুধুমাত্র তরল খাবার গ্রহণ এর কারনে শরীরে ক্লান্তি অনুভব হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত ডিটক্স পান শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

 

হাই প্রোটিন ডায়েট কি?

এ ডায়েট এর ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ কমিয়ে হাই প্রোটিন খাবার খেতে হয়। শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্য সম্পাদনের জন্য প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র হাই প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহনের মাধ্যমে ডায়েট করাকে হাই প্রোটিন ডায়েট বলে।

হাই প্রোটিন ডায়েট – এর খাদ্যতালিকাঃ

চিকেন, টার্কি, সামুদ্রিক মাছ, নানা ধরনের ছোট মাছ, ডিম, ব্রাউন ব্রেড, ব্রাউন রাইস, বাদাম, কুমড়ো, ফ্লাক্সসিড, সানফ্লাওয়ার সিড খাওয়া যাবে।

যা বাদ দিতে হবেঃ 

এখানে কার্ব বাদ দেওয়া যাবে না। খুবই অল্প পরিমাণে কার্ব  নিতে হবে।

সুবিধাঃ 

১। প্রোটিনযুক্ত খাবার শরীরে শক্তি জোগায়। 

২। পেশীর শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৩। ওজন হ্রাস করে।

অসুবিধাঃ 

১. নিশ্বাসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।

২. ডিহাইড্রেশন হয়।

৩. কিডনিতে সমস্যা দেখা যায়।

৪. হজমে সমস্যা দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের  পরামর্শঃ  সবার শরীরের তারতম্য এক না হওয়ায়  ডায়েট করার কারনে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই যে কোন ডায়েট করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নিয়ে করা উচিত।

আমরা ডায়েট কেন করব?

সুস্থ থাকা যে কোন মানুষেরই কাম্য। ইদানিং বেশিরভাগ মানুষ Junk food  খেতে বেশী পছন্দ করছে। যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে অনেকেই ডায়েট করেন আধুনিক  যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে অন্যদের তুলনায় রোগা বানানোর প্রতিযোগিতায়। যা মোটে ও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।  নিজেকে সুস্থ রাখতে আমরা নিয়মিত পরিমানমত খাবার গ্রহন করে ডায়েট করব। ডায়েট করলে বিভিন্ন রোগ ব্যাধি থেকে দূরে থাকা যায়। 

 

ডায়েট আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস কে একটা পরিমান এর মধ্যে নিয়ে আসে। বিভিন্ন ধরনের ডায়েট রয়েছে। তবে সব ধরনের ডায়েট সবার জন্য গ্রহণযোগ্য না ও হতে পারে। শরীরের তারতম্য ভেদে ডায়েট ও ভিন্ন হয়। তাই একজন বিশেষজ্ঞ ডায়েটিশায়ন এর সরনাপন্ন হয়ে আপনার জন্য উপযুক্ত ডায়েট বেছে নিন এবং সুস্থ থাকার প্রয়াস চালান।

 

1 Comment

    • Tanzila Farzana -

    • January 30, 2020 at 23:53 pm

    Thanks a lot… Actually very effective advice..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *